1. Borhanuddinofficial6@gmail.com : Borhan Uddin : Borhan Uddin
  2. admin@iqbalahmed.info : Iqbalahmed :
কালের স্বাক্ষি ও ইতিহাসের মহাপুরুষ বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত জীবন
কালের স্বাক্ষি ও ইতিহাসের মহাপুরুষ বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত জীবন

ইকবাল আহমেদ লিটনঃ আজকের বর্তমান পরিস্থিতিতে মুজিব আদর্শ থেকে ছাত্র রাজনীতির অনেক কিছু শিক্ষনীয় বিষয় আছে, যা ছাত্র রাজনীতির বিকৃতি থেকে ছাত্র রাজনীতি পরিশুদ্ধতার পথ খুঁজতে পারে।

একজন মানুষকে আমরা হত্যা করেছিলাম। হত্যা কথাটি এই জাতির জন্য যুক্তিযুক্তি। কেন না আমরা সেই মহাপ্রায়নে প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলাম, বা ঘরের কোনায় লুকিয়ে ছিলাম। এক সময় ধীর গতিতে শামুকের খোলস খুলেছিল ঠিকই কিন্তু সেইভাবে মহান মানুষটিকে যোগ্য স্থানে বসাতে পারিনি। এই লজ্জা আমাদের, এই লজ্জা সমগ্র বাঙালি জাতির। আজ এতটা বছর পর তিনি মহাকালের স্বাক্ষী হয়ে বেড়িয়ে এলেন। আমরা অনুভব করছি কতটা সহজ, সাবলীল সাধারণ, নিরঅহংকার ছিলেন তিনি। তার লিখিত অসম্পূর্ণ আত্ম জীবনীতে তিনি বলছেন, তার প্রিয়তমা রেণুকে ”লিখতে যে পারি না, আর এমন কি করেছি! যা লেখা যায়! আমার জীবনের ঘটনাগুলি জেনে জনসাধারণের কি কোন কাজে লাগবে? কিছুইতো করতে পারলাম না। শুধু এই টুকু বলতে পারি নীতি ও আদর্শের জন্য সামান্য একটু ত্যাগ স্বীকার করতে চেষ্টা করেছি”।
টুঙ্গীপাড়ার খোকাবাবু কখনো নিজেকে রাজা বাদশাদের সমগোত্রীয় মনে করতেন না। যদিও শেখ বংশের চকমিলান দালানে শেষ পেরেকটা তিনি ঠুকেছিলেন সাধারণ মানুষের হয়ে। জমিদার সামন্তরা যদি বাংলায় টিকে থাকে তাহলে বাঙ্গালির শৃংখল যে মোচন হবে না তা তার ভালো করেই জানা ছিল। তিনি জীবনের প্রতিটি মুহুর্ত দিয়ে গেছেন বাঙালির জন্য। আবার তিনিই তা নগন্য করে দেখিয়ে বলছেন “কিছুই তো করতে পারলাম না”।

তার জীবনের গল্পটা তিনি যেখান থেকে শুরু করেছিলেন, সেটা হতে পারতো অনেকটা নিজেকে জাহির করে বিশেষ জায়গায় দ্বার করানোর মত একটা সুযোগ। নেহেরু থেকে শুরু করে পৃথিবীর বিখ্যাত অনেক নেতার জীবনই ছিল কিছুটা রহস্যের আদলে ঢাকা। সেখানে মুজিব কথা বলছেন দ্বিধাহীন চিত্তে। সাহসটা তিনি সঞ্চয় করেছিলেন বংশানুক্রমে। পূর্ব পুরুষ কদু শেখ এক ইংরেজের আধা পয়সা জরিমানা করেছিলেন, শেখদের নৌকার বহর ভেঙ্গেছিল বলে। লজ্জায় মাথা কাটা গিয়েছিল ইংরেজের, ”কালা আদমী” জরিমানা করেছে ”আধা পয়সা”। পূর্ব পুরুষের এই সাহসী ভুমিকা জীবনে তার চলার পথকে বেগবান করেছে। কিশোর জীবন থেকেই তিনি দেশ শত্রুকে চিনতে পেরেছিলেন। স্বদেশী আন্দলোন সুভাসবসু আরও অনেক বিপ্লবীর নাম তিনি শুনেছেন কিশোর বয়সেই। হামিদ মাস্টারের কাছে সুর্যসেনের অস্ত্রাগার লুষ্ঠনের গল্পটা তাকে কিছুতেই স্থির থাকতে দিতো না। তিনি যেন কোন আহবানে, ভিন্ন ধারায় নিজ থেকেই খুঁজে চলেছেন তার গন্তব্য। অকপটে তার গ্রন্থে বলছেন-“মুজিব ভয়ানক ছেলে। ছোরা মেরেছিল রমাপদকে” তার বিরুদ্ধে অভিযোগকারীর এই ছিল মিথ্যে ভাষণ। সেদিন দুজনেই লাঠি দিয়ে মারামারি করেছিল, মিথ্যা কে তিনি অপছন্দ করতেন। রমাপদের এই মিথ্যাচারে মুজিবের কিশোর বয়সে প্রথম কারাবাস। তারপর থেকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো জুলুম নিগ্রহ, নিপীড়ন আর কারাবাসেই কাটে তার।
প্রথম কলকাতা গিয়ে তিনি বিনোদন খুঁজেননি, তিনি দেখা করলেন শহিদ সাহেবের সাথে। মুজিবের অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে সোহরাওয়ার্দী, হোসেন শহীদ সাহেবকে তিনি শহীদ নামে উপস্থাপন করেছেন। তিনি তার রাজনৈতিক শিক্ষা গুরু। বইয়ের প্রতিটি পাতায় তিনি গুরুর প্রতি ঋণ স্বীকার করেছেন। একজন লড়াকু মানুষের জীবন কাহিনী। যিনি ২৯ বছর পরে ফিরে এসে জাতিকে আবারো ইতিহাসের পাঠ দিচ্ছেন। ইতিহাস কখনো বিলিন হয় না। ইতিহাস এভাবেই ফিরে আসে। যুদ্ধের ময়দানে নিষ্কর্ম সেনাপতি নন, তিনি যোদ্ধা। এমন একজন যোদ্ধা যিনি মানুষ এবং প্রকৃতি প্রেমিক স্বাধীনতাকামী অকুতোভয়। রাজা বাদশারা যখন আরামে আয়েশে পাকিস্তানে প্রভুদের পকেটে ঝিমিয়ে আছেন, তিনি তখন ছুটছেন ভারতবর্ষের পথে প্রান্তরে। রংপুরে এক এম এল একে ডাকতে এসে মশার কামড় খেয়েছেন, প্রায় নিরন্ন অবস্থাতেই ফিরে গেছেন, তবু তার ক্লান্তি নেই। নেতা ডাকলেই তিনি ছুটছেন। মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ট এলাকা নিয়ে পাকিস্তান আনতে হবে, প্রতিষ্ঠা করতে হবে বাঙালির স্বাধীকার। ২০০ বছরের বিপ্লবীদের শুধু রক্তক্ষয় হয়েছে, স্বাধীনতা আসেনি। মুজিব কলকাতার বেকার হোষ্টেলে শুয়ে বাঙালির মুক্তির কথাই ভাবছেন। এই অপ্রতিরোধ্য কর্মবীর চোখ ফেলছেন ভবিষ্যতের দিকে। মুসলিমলীগ নেতাদের রাজনীতি পূর্ববঙ্গে যে শুধু কাগজে কলমে তিনি তা বুঝেছিলেন। পরশ্রীকাতর বাঙালির হৃত গৌরব তিনি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে চান-তাই তার কোন অবস্থাতেই ছুটি নেই-এ যেন অলিখিত ব্যস্ততা। সব বৈষম্য দূর করে বাংলার মানুষকে স্বাধীকার দেবার অঙ্গিকার।

অনেকগুলো মহাকালকে এক করে চলেছেন তিনি। তাই কোন অবস্থাতেই তিনি সময় নষ্ট করতে রাজি নন। মওলানা আজাদ সোবহানী একজন বিখ্যাত ফিলোসফার, মুসলিমলীগের হাশিম সাহেব তাঁর অন্ধ ভক্ত। তিনি দলের ছেলেদের রাজনৈতিক শিক্ষা দেবার জন্য তাঁকে ডেকে পাঠালেন। সবাই ক্লাস করছে, মুজিব কিছুক্ষণ থেকে ভেগে গেছেন, তিনি বন্ধুদের বলছেন ”তোমরা পন্ডিত হও, আমার অনেক কাজ। আগে পাকিস্তান আনতে দাও, তার পরে বসে বসে আলোচনা করা যাবে”। ১৯৪৩ সাল, ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃতদেহ, নিরন্ন মানুষের হাহাকার মুজিবকে অস্থির করে তুলছে। সেই সময় মুসলিমলীগেও কিছু পরিবর্তন আসে। প্রগতিবাদী অন্যটি প্রতিক্রিয়াশীল দুটি গ্রুপে মুসলিমলীগ বিভক্ত হয়ে যায়। মুজিব নিজেই তার গ্রন্থে বলছেন ”মুসলিমলীগ তখন পর্যন্ত জনগণের প্রতিষ্ঠানে পরিনত হয় নাই। জমিদার জোড়দার ও খান বাহাদুর নবাবদের প্রতিষ্ঠান ছিল।” খাজা নাজিমউদ্দিনের দলের লোকজন ছিল প্রতিক্রীয়াশীল, যারা ছিল জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন, অপরটি শহীদ সাহেবের নেতৃত্বে হাশিম সাহেবের দল ছিল প্রগতিশীল। মুজিব সেই সময় প্রাদেশিক মুসলিমলীগের সদস্য হন। মুজিব দলবল নিয়ে দুর্ভিক্ষের ময়দানে ঝাপিয়ে পরলেন। নাজিমউদ্দিন তখনো ষড়যন্ত্র করে চলেছেন। তার ছোট ভাই খাজা সাহাবউদ্দিন সাহেবকে শিল্প মন্ত্রীর পদ দিয়েছেন। খাজা বংশ থেকে ১১ জনকে এম এল এ বানিয়েছেন। শহীদ সাহেব সেই সময় সিভিল সাপ্লাই মন্ত্রী। তিনি মুজিবকে লঙ্গরখানা খুলতে নির্দেশ দিলেন। দুর্ভিক্ষ দিনের বর্ণনা করেছেন মুজিব এমন দক্ষতায়, যে কোন রিপোর্টারের কাছে এই বর্ণনা লোভনীয়। সারাদিন মুসলিমলীগ অফিস, কলকাতা মাদ্রাসা বিভিন্ন জায়গায় লঙ্গরখানায় কাজ করে দলবলসহ এই মানুষটি ঘুমচ্ছেন লীগ অফিসের টেবিলে নয়তো বেকার হোষ্টেলে। ইংরেজদের মনোযোগ তখন দুর্ভিক্ষে নয়, তাদের মনোযোগ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে। মুজিব লিখছেন ”ইংরেজের কথা হলো বাংলার মানুষ মরে মরুক। যুদ্ধের সাহায্যে আগে…..যুদ্ধ করে ইংরেজ আর না খেয়ে মরে বাঙালি।”

যারা রাজনীতিতে কোটারী করেছে দুর্নীতি করেছে এই সব লোকেদের তিনি ঘৃনা ছুড়ে দিয়েছেন প্রকাশ্যে। এমন কি অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়াটাকেও তিনি মহাপাপ মনে করতেন। তিনি রাজনৈতিক বক্তৃতায় পারদর্শী ছিলেন। সিপাহী বিদ্রোহ, ওহাবি আন্দোলন, তিতুমীর, হাজি শরিয়তুল্লা, ফরাজি আন্দোলন থেকে ঐতিহাসিক উদ্ধৃতি দিতেন। আক্রমণ করতেন হিন্দু বেনিয়াদের, যারা ইংরেজের তাবেদার হয়ে মুসলিম গৌরবকে লুপ্ত করে ইংরেজ শাসনকে তরান্বিত করেছিল। মুজিবের আত্মজীবনী গ্রন্থে প্রসঙ্গক্রমে যার নাম আনন্দ বেদনায় বার বার ঘুরে ফিরে এসেছে তিনি বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। এই মানুষটির মুজিবের জন্য পথ চেয়ে থাকা, তার অব্যক্ত বেদনা, লুকানো অশ্রুজল, পিতৃহারা সন্তানের মায়ের মতই তাঁর সন্তানদের আগলে রেখেছেন এবং সাহস যুগিয়েছেন মুজিবকে। মুজিব নিজেই স্ত্রী সম্পর্কে বলেছেন, ”রেণু কষ্ট সহ্য করে চলেছেন, আমি বাড়ি গেলেই কিছু টাকা জোগার করার চেষ্টায় থাকতো”। আর একজায়গায় তিনি বলছেন “কামালের জন্ম হয়েছে, ভাল করে দেখতেও পারি নাই ওকে। হাসিনা তো আমাকে পেলে ছাড়তেই চায় না। অনুভব করতে লাগলাম যে, আমি ছেলে মেয়ের পিতা হয়েছি। আমার আব্বা ও মাকে দেখতে মন চাইছে। তারা জানেন লাহোর থেকে ফিরে নিশ্চই একবার বাড়িতে আসবো। রেণু তো নিশ্চই পথ চেয়ে বসে আছে। সে তো নীরবে সকল কষ্ট সহ্য করে, কিছু বলে না, বা বলতে চায় না। সেই জন্য আমার আরও বেশি ব্যথা লাগে।” কখনো তাঁর মধ্যে স্ত্রী সূলভ আচরণ পরিলক্ষিত হয়নি। একজন যোগ্য দেশ মাতা তিনি। বিবাহিত জীবনের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা খুব বেশী নেই তার জীবনে। কেননা মুজিব অধিকাংশ সময় জেলে বন্দি, ফেরার নয়তো পথে প্রান্তরে সংগঠনের কাজে ব্যস্ত। রেণু প্রসঙ্গে নেলসন মান্ডেলার সাবেক স্ত্রীর ইউনি ম্যান্ডেলার কথা মনে পড়ে যায়। ম্যান্ডেলার ২৫ বছর কারা জীবন, স্বামীর হয়ে নেতৃত্ব কাঁধে তুলে নেয়া এবং আফ্রিকার কালো মানুষের মুক্তির অন্বেষায় আন্দোলন করেছেন তিনি। রেণু সরাসরি রাজনীতির ময়দানে নেই হয়তো, কিন্তু পর্দার অন্তরাল থেকে বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য তার যে বিসর্জন বেদনা এবং বঞ্চনা তা জাতির কখনই ভোলা উচিত নয়। মুজিবকে আমরা হকার হিসাবেও দেখতে পাই। মুসলিম লীগের অনেক কর্মীর সাথে তিনিও রাস্তায় দাড়িয়ে ”মিল্লাত” পত্রিকা বিক্রি করেছেন। হিন্দু মুসলিম দাঙ্গায় নুরুউদ্দিন, নুরুল হুদা সহ তিনি ঠেলাগাড়ী ঠেলে মুসলিম আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে খাবারের যোগান দিয়েছেন। দাঙ্গা সম্পর্কিত ভয়াবহ বর্ণনা আছে এই বইটিতে। তিনি একজায়গায় লিখেছেন ”মানুষ মানুষকে এইভাবে হত্যা করতে পারে”! চিন্তা করতেও ভয় হয়”। যিনি মানুষ হত্যাকে জঘন্য পাপ মনে করতেন। তাকেই কিনা সমগ্র পরিবারসহ পৃথিবীর জঘন্যতম হত্যার স্বীকার হতে হয়েছিল।

ফরিদপুরের মধুমতি পাড়ে মানুষটি সর্বদায় পানির জন্য কেঁদেছেন। কনভেনশনে ফজলুল কাদের চৌধুরীসহ দিল্লী আজমির শরিফ বেড়াতে যাওয়া। আজমির শরিফ তারাগড়ের মাঝখানে শুধু মরুভুমি-সব ভালো লেগেছে তার, মরুভুমি তাঁকে টানেনি। তিনি লিখছেন ”পানির দেশের মানুষ আমরা, পানিকে বড় ভালবাসি”, দিল্লীতে তাজমহল পরিদর্শনের ঐতিহাসিক বর্ণনা দিয়েছেন তিনি মনের মাধুরী মিশিয়ে। এই বর্ণনা তার ভিতরের রোমান্টিক মানুষটিকে জাগ্রত করেছে। তাজের বর্ণনা তিনি এভাবে করেছেন ”সুর্য যখন অস্ত গেল, সোনালী রং আকাশ থেকে ছুটে আসছে। মনে হলো চাঁদের যেন আর একটা নতুন রুপ। সন্ধ্যার একটু পরেই চাঁদ দেখা দিল। চাঁদ অন্ধকার ভেদ করে এগিয়ে আসছে। আর সাথে সাথে তাজ যেন ঘোমটা ফেলে দিয়ে নতুন রূপ ধারণ করছে। কি অপূর্ব দেখতে! “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার বত্তৃতায় রবীন্দ্র নজরুল থেকে উদ্ধৃতি দিতেন। বাঙালির সংকটে তারাই ছিলেন তার দুঃসময়ের সাথি। এমনকি জেলের সংকীর্ণ রুমে শুয়ে একটু জোৎস্না দেখার জন্য তিনি উতলা হয়েছেন। এমন একজন কোমল হৃদয়ের মানুষ, তাকে আমরা কত ভাবেই না কর্দমাক্ত করেছি। ২৬ মাসের জেল হয়ে গেছে তার। এ দিকে ১৯৫২ সালের জানুয়ারী মাসে ঘোষনা হয়েছে “উর্দূই হবে পাকিস্থানের রাষ্ট্র ভাষা”। মুজিব হাসপাতালের কঠোর বেষ্ঠনিতে আবদ্ধ। দেখা সাক্ষাৎ দিনের বেলায় কিছুটা শিথিলযোগ্য। ওলি আহাদ, মোহাম্মদতোহা, শওকত মিয়া আরও কয়েকজন আওয়ামী লীগ কর্মীদের নিয়ে গভীর রাতে হাসপাতালের বারান্দায় বসে “সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন” করার জন্য এবং ২১শে ফেব্রুয়ারী রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করার জন্য সিদ্ধান্ত হয়। সরকার এই ঘটনা বুঝতে পেরে মুজিবকে পূনরায় জেলে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেন। মুজিব আমরণ অনশনের প্রস্থুতি নেন। একদিকে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন অন্যদিকে মুজিবের অনশন। পরবর্তী ঘটনা সবারই জানা। মুজিব কিন্তু বন্ড দিয়ে মুক্তি নেননি। জনগণের আন্দোলনের মুখে তাকে ছাড়তে সরকার বাধ্য হয়েছিল। তিনি ১৯৫৩-৫৪-৫৫ পর্যন্ত সম্ভবত লিখতে পেরেছিলেন। পরবর্তী পর্যায়ে রাজনৈতিক ব্যস্ততার কারনে সম্ভবত কলম ধরতে সময় পাননি। দেশে ঘনঘন পট পরিবর্তন জেল জীবন, ২১ দফা, ৬ দফা, ৬৮ তে তার বিরুদ্ধে আগারতলা ষড়যন্ত্র, ৬৯ এ ৬ দফা সহ ১১ দফা দাবী আদায়ের সংগ্রাম। ৭০ এর নির্বাচন, ১৯৭১ এর ৭ই মার্চ এ মুক্তিযুদ্ধর ডাক ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে নিরস্ত্র মানুষের স্বসস্ত্র সংগ্রাম। সময় কোথায় মুজিবের? তার জীবনতো অসমাপ্তই রয়ে যাবে। জীবনী লেখার জন্য তার জন্ম হয়নি। তার জন্ম হয়েছিল বাঙালিকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করার জন্য। সেই নেতাকে আমরা হত্যা করলাম। যিনি মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী স্বাধীন দেশে আর্ন্তজাতিক বিশ্বের কাছে কোনঠাসা। রাশিয়ান বিপ্লব তাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল, ইন্ডিয়া রাশিয়ার সহযোগীতায় যে বন্ধুত্ব তৈরী হয়েছিল তা ছিল অনেকের কাছে ঈর্ষনীয়। উল্টোদিকে ডানপন্থিরা এবং স্বাধীনতা অর্জনে ঘোর নাখস আমেরিকা, চিনের তাবেদাররা তো মুজিবের বিরোধীতা করবেই। মুজিব নিজেই তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন “আমি কমিউনিষ্ট নই। তবে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং পুঁজিপতি অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি না।” তিনি দেশের বিশিষ্ট সমাজতান্ত্রিক, ডানপন্থি, অর্থনীতিবীদের নিয়ে বাঙালির ভাগ্য উন্নয়নে ”বাকশাল” গঠন করলেন। পরপরই তাকে নৃশংস হত্যা করা হলো। যে শিশুর জন্মই হলো না। সেই শিশুকে বিষোদগারের বিষে আজো প্রতিমূহুর্তে হত্যা করে চলেছে প্রতিক্রিয়াশীলরা।
একজন উদার মনের মানুষ জীবন যার শুরু হয়েছেছিল সাধারণভাবে। ইচ্ছে করলে পার্টির টাকা অথবা এম.এল.এ দের কাছ থেকে চাঁদা তুলে জীবন নির্বাহ করতে পারতেন। ছাত্র অবস্থায় তিনি তা করেননি। আজকের বর্তমান পরিস্থিতিতে মুজিব আদর্শ থেকে ছাত্র রাজনীতির অনেক কিছু শিক্ষনীয় বিষয় আছে, যা ছাত্র রাজনীতির বিকৃতি থেকে ছাত্র রাজনীতি পরিশুদ্ধতার পথ খুঁজতে পারে। তিনি যদি একনায়ক স্বৈরাচার হতেন তবে তার নৃশংস হত্যাকান্ডের পর ধানমন্ডির বাড়িতে কথিত ব্যাংক লুটের কাড়ি কাড়ি টাকা খুজেঁ পাওয়া যেত। সম্মান্বিত প্রাবন্ধিক ”আমরা কোথাও ভুল করছি নাতো”। আমরা শেষ পর্যন্ত আইয়ুব খানের সাথে বঙ্গবন্ধুর তুলনা করছি। বরং তার সঙ্গে গান্ধী, লুথার কিং অথবা নেলসন মান্ডেলার মতো মানুষের সাথে তুলনা হতে পারে। মুজিব তার গ্রন্থে উগ্র হিন্দুদের সমালোচনা করে বলেছেন ”তারা গান্ধীকে হত্যা করেছে”। তারা অনেক কিছু পারে। আমরা বাঙালিরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছি-আমরা অনেক কিছু পারি। আমরা ৪৪ থেকে ৫২, ৫২ থেকে ৬৯, ৭০, ৭১ কে অস্বীকার করার মত স্পর্ধা রাখি। কেননা আমরা জাতির জনককে হত্যা করেছি। আমরা আছি ইডিপাসিও ট্রাজিডির মধ্যে। তাঁর অসমাপ্ত জীবনী পরে মনে হয়েছে- আমরাই হত্যাকারী আপনাকে আমরা আজও চিনতে পারিনি-এমনকি খোদ আওয়ামী লীগও না। শেখ কামালের মুখ দিয়ে জাতি যেন আজও দ্বীধান্বিত হয়ে বলছে। ”তোমার আব্বাকে আমরা আব্বা বলতে পারি তো”। অথচ জনক কিন্তু দুহাত বাড়িয়েই আছেন। ক্ষমা করছেন ক্রমাগত। পিতা তো সন্তানকে কখনো শাস্তি দিতে পারেন না। আমরা পারি, আমরা মীরজাফরের বংশধর, ক্ষমা করবেন পিতা, ক্ষমা করবেন আমাদের এই দ্বীনতা।

লেখক: সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, সদস্য সচিব, আহবায়ক কমিটি, আয়ারল্যান্ড আওয়ামী লীগ, ইকবাল আহমেদ লিটন।