1. Borhanuddinofficial6@gmail.com : Borhan Uddin : Borhan Uddin
  2. admin@iqbalahmed.info : Iqbalahmed :
মাতৃভাষা হোক প্রতিটা বাঙালির মন মসজিদ
মাতৃভাষা হোক প্রতিটা বাঙালির মন মসজিদ

ইকবাল আহমেদ লিটন: লেখার শুরুতে সকল ভাষা শহীদের প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। বাঙালি জাতির গৌরবের মাস ফেব্রুয়ারি মাস। আমাদের ভাষা আন্দোলনের মাস। বাঙালি জাতির ঐতিহ্যময় ও গৌরবের ভাষা আন্দোলনের মূল্যবোধ এবং স্বাধীনতার উপর তার প্রকৃষ্ট প্রভাব অনস্বীকার্য। কেবল তাই’ই নয় ভাষার জন্য আন্দোলন করে এরূপ জীবন উৎসর্গ বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। ভাষা আন্দোলন অর্থাৎ ২১শে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের জনগনের গৌরবজ্জ্বল একটি দিন। এটি আমাদের কাছে ঐতিহ্যময় শহীদ দিবস। এই দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবেও সুপরিচিত সারা বিশ্বে। জাতিসংঘের ইউনেস্কো কর্তৃক ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষনা করায় বাঙালি জাতির জন্য এই দিনটি বিরাট এক গর্ব বয়ে এনেছে সুনিশ্চিতভাবেই। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ৮ই ফাল্গুন ১৩৫৯ বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে কয়েকজন দেশ প্রেমিক তরুণ ভাষার জন্য শহীদ হন। তাই এ দিনটি শহীদ দিবস হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে বাঙালির হৃদয়ে মহান মহীমায়।

এবার আসা যাক আসল কথায়, সাজসজ্জার জন্য ২১শে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে সরকার ও প্রশাসন কর্তৃক নির্দেশ যাবে আর সাথেসাথেই শুরু হয়ে যাবে শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার ধোঁয়ামোছার কাজ। সারা বছর অবহেলায় পড়ে থাকা শহীদ মিনার এইদিনে সুন্দরভাবে রুপ নেবে ফুল আর ফুলের ঘ্রাণে আরও কতকি! আমাদের দলীয় নেতা কর্মীরা ও বিরোধী দলীয়রা বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যানার ও ফুল নিয়ে যাবে শ্রদ্ধাভরে শহীদদের স্মরণ করার জন্য। আর বিভিন্ন রেডিওর আরজেরা বলবে হাই ফ্রেঞ্চ তোমরা সবাই কেমন আছো? আই হোপ তোমরা সবাই ভালো আছো। তোমরা জানো আজ international mother language day. so যারা যারা শহিদ মিনারে ফুল দিয়েছো আমাকে জানাও ইত্যাদি ইত্যাদি। যাইহোক, আরজেরা বাংলা ভাষাকে সবচেয়ে বেশী বিকৃত করে। তরুন-তরুনীরাও ফেব্রুয়ারি এর আগের রাতে একে অপরকে ফুল পাঠিয়ে চিরকুটে লিখে দিবে আই লাভ ইউ! কাল তোমার জন্য শহীদ মিনারে ওয়েট করব। তারপরে শহীদ মিনারে এসে বলবে, আই মিস ইউ টু। সকল গুরুজনেরা শিক্ষক ও শিক্ষিকা থেকে শুরু করে সবাই লেকচার দেয় বাংলা সাহিত্যে অনার্স করলে কি হবে? না জুটবে একটা ভালো চাকরি, না জুটবে কপালে স্ত্রী। বাবা মা বলে, দরকার নাই বাংলাতে অনার্স করার তার চেয়ে ভালো বিদেশ চলে যাও।

সরকারি চাকরিতে কোনদিন বিজ্ঞপ্তি দিবে না যে বাংলাতে অনার্স ও মাস্টার্স করা প্রাথীদের চাকরিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। আপনি সুন্দর করে গুছিয়ে বাংলা বলতে পারেন, আপনাকে কেউ স্মার্ট বলবে না কিন্তু বাংলা আর ইংরেজি মিশ্রণে বাংলিশ বলেন দেখবেন সমাজে আপনার কত কদর। আজ জুতা না পরে শহীদ মিনারে যে তরুন তরুনীরা ফুল দিবে ও শ্রদ্ধা জানাবে, ঠিক পরেরদিন তারাই আবার শহীদ মিনারে বসে জুতা পরে আড্ডা দিবে। যারা বাংলা ভাষা নিয়ে গবেষনা করে এবং সভা সেমিনারে বড় বড় কথা বলবে আগামিতে তাদের মেয়ে অথবা ছেলের বিয়ের পাত্র-পাত্রি যদি বাংলাতে অনার্স করা হয় তাহলে তারা বলবে, বাংলাতে অনার্স? এককথায় তারা না বলে দিবে। খোঁজ নিয়ে দেখেন তাদের ছেলে মেয়ে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াশোনা করছে। আর সুশীলদের কথা না বলাই ভালো। আমি সহ দেশের প্রায় ৯৫% বাঙালি শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে পারেনা/পারিনা। এই দায় কার?

যাইহোক মিষ্টি বা তিতা হলেও সত্য আমরা এমন এক জাতি যারা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছি, আমরা এমনই এক জাতি যারা দেশকে স্বাধীন করব বলে প্রান দিয়ে যুদ্ধ করেছি। আমরা এমনই এক জাতি যারা আধুনিকতা দেখাতে গিয়ে নিজের ভাষার গানশুনে নাক সিটকিয়ে বলি, যত্তসব!! আমরা এমনই এক জাতি যারা সারা বছর শহীদ মিনারে জুতা নিয়ে হাটি আর ২১ শে ফেব্রুয়ারি আসলে সেই জুতা’ই হাতে নিয়ে ফুল দিই। আমরা সেই জাতি যারা শহীদ মিনারে ফুল দিতে নয় যায় সেলফি তুলতে। আমরা সেই জাতি যারা শুধু নিতে শিখেছি দিতে নয়। আসুন না যে দেশ আপনাকে এত কিছু দিয়েছে, সেই দেশকে কিছু দিই? আপনি বদলান বদলাবে সবকিছু। আসুন না দেশকে ভালবাসি, লোক দেখানোর জন্য নয় বরং ভালবাসি অন্তরের অন্তস্থল থেকে। আসুন হয়ে উঠি একজন আসল বাংলাদেশি ও মনে প্রাণে বাঙালি। অধিক অহংকার ও অধিক মহব্বত তথা দরদের ভাষা আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষাকে আদৌ সঠিকভাবে ব্যবহার করে তার হক আদায় করছিনা, যে ভাষা প্রতিষ্ঠিত করতে বহু বাঙালির তপ্ত খুনে রাজপথ রক্তাক্ত হয়েছে সালাম, রফিক, শফিক, বরকত সহ শত নাম।

সেই মাতৃভাষা আজ কতটা বঞ্চিত এবং অবহেলিত সেই দিকটাও কিন্তু কম বিস্ময়ের নয়? রাষ্ট্রীয়ভাবে ২১শে ফেব্রয়ারি তথা ভাষা দিবস পালনের জন্য আপনি আমি তা অনুভব করতে পারছি। শিক্ষা ও মর্যাদার ক্ষেত্রে এ দেশেই বাংলার চেয়ে ইংরেজীকে দ্বিগুণ গুরুত্ব দেওয়া হয় যেমন- অফিস, আদালত, ব্যাংক, বীমা, স্কুল, কলেজ সর্বত্রই ইংরেজীর ছড়াছড়ি। প্রত্যেক সেক্টরেই মাতৃভাষা বাংলার পরির্বতে ইংরেজীকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়ে থাকে। মায়ের ভাষা বাংলা আজ দেশের কিছু উচ্চ শিক্ষিতদের নয়। তাদের ভাষা হলো ইংরেজী কিন্তু বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও বক্তব্যের দ্বারা মাতৃভাষার গুরুত্ব আমরা বুঝিয়ে থাকি, কাজকর্মে বাংলা ভাষাকে তেমন একটা গুরুত্ব দিইনা। এমনকি ছোটছোট শিশুদেরকেও বাংলা ভাষা না শিখিয়ে শুরুতেই ইংরেজী ভাষা (মাম্মী, ড্যাড, আংকেল, আন্টি) ইত্যাদি শিক্ষা দিয়ে থাকি। কিছু বাঙালিরা নিজেদেরকে স্বার্থক ও সফল বাঙালি হিসাবে পরিচয় দিতেও লজ্জাবোধ করে। অথচ অনেক বাঙালি এই বাংলার জন্যই তাদের তাজা প্রাণ দিতেও দ্বিধাবোধ করেননি। অনেককেই মাতৃভাষা বাংলার জন্য শহীদ হতে হয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল একটি দৃষ্টান্ত যে, মাতৃভাষার জন্য নিজেদের প্রাণকে বিলিয়ে দিয়েছে একমাত্র বাংলাদেশের বাঙালিরা। বিশ্ববিখ্যাত ঐতিহাসিক পর্যটক ইবনে খালেদুন বাংলা ভাষা সম্পর্কে একটি উক্তি পেশ করেছেন, তিনি বলেন, প্রত্যেক শিক্ষাই তার মাতৃভাষায় হওয়া চাই, কেননা অপরিচিত ভাষার মাধ্যমেই শিক্ষা দান ও অর্জন অসম্পূর্ণ শিক্ষারই নামান্তর। এছাড়া সাহিত্যিক মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী (রা:) বলেন যে, মাতৃভাষার প্রতি অবজ্ঞা, অবহেলা করা জাতি হত্যারই নামান্তর। যাইহোক, মাতৃভাষা বিধাতার একটি বড় উপহার। আমরা বাঙালি এবং আমাদের ভাষাও বাংলা অতএব, সঠিক ও সুন্দরভাবে বাংলা ভাষাকে আমাদের সবাইকে মর্যাদা ও মূল্যায়ন করতে হবে। যেহেতু বাংলা ভাষার জন্যই ২১শে ফেব্রুয়ারি রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল রাজপ আর সেই ইতিহাসকে ভুলে গেলে চলবে না। শেষ কথা হচ্ছে, শুধু ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসাবে পালন করলেই হবে না সেই সাথেসাথে ২১শে ফেব্রুয়ারির সকল শহীদদের জন্য তাদের আত্নার শান্তি কামনা সহ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতে হবে। সর্বপরি, বাংলা ভাষাকে হৃদয়ে ধারন করতে হবে। সৃষ্টিকর্তা আমাদের সবাইকে বিজাতীয় সংস্কৃতি বর্জন করে ২১শে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা বাংলাকে যথাযথ মর্যাদার ও শ্রদ্ধার সাথে পালন করার তাওফিক দান করুন। সকল ভাষা শহীদদের প্রতি রইল আমার বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

লেখকঃ সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, সদস্য সচিব আয়ারল্যান্ড আওয়ামী লীগ, ইকবাল আহমেদ লিটন